‘বিবাহবিডি ডটকম’ একযুগের ডিজিটাল ঘটকালি

digitalsomoy

ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বদলে যাচ্ছে অনেক সেবা। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি হলো ‘ম্যাট্রিমনিয়াল সার্ভিস’। সহজ বাংলায় যাকে বলা হয় ঘটকালি। এখন পাত্র ও পাত্রীর খোঁজ করতে হলে ঘটক না ধরলেও চলে। হাল দুনিয়ায় ঐতিহ্যগত এই সেবাটি স্থান করে নিয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। গোটা দুনিয়ায় মেট্রিমনি সার্ভিসের চাহিদা তুমুল। পাশের দেশ ভারতেও এই সেবাটি চালু হয়েছে ২৬ বছর আগে এবং এই সেবা পরিচালনা করছে ভারতের বিগ জায়েন্ট কোম্পানিগুলো। আর বাংলাদেশে?

বাংলাদেশে এক যুগ আগে ম্যাট্রিমনি সার্ভিস চালু করেছে ‘বিবাহবিডি ডটকম’। এর মধ্যে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত পাত্র ও পাত্রীদের বিপুল ডাটা তৈরি করেছে পোর্টালটি। দেশিয় ম্যাট্রিমনি সার্ভিসের ওপর প্রতিবেদনটি তৈরি করতে গিয়ে এর খোঁজ পাওয়া যায়। দেখতে সুন্দর, সাজানো গোছানো পোর্টাল। হোম পেজে সার্ভিসের ব্যাপারে ধারণা দেওয়া আছে। ওখানেই আছে সাইন আপ করার অফার। যোগাযোগ করা হলে বিবাহবিডি ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম মনোয়ার ফ্রেজার কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে।

ফ্রেজার বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সারা বিশ্বের বাংলাদেশি পরিবারগুলোর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া। প্রত্যেকটা মানুষের চাহিদার নিজস্বতা রয়েছে। আর এই নিজস্বতাকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা আমাদের আমাদের সাইটটি ডেভেলপ করেছি, সমন্বয় করেছি মানুষের চাহিদার সাথে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার’

তিনি বলেন, ‘কেউ চাইলেন আর এই সাইটে প্রোফাইল সাবমিট করে ফেললেন, ব্যাপারটা এমন নয়। এখানে শতভাগ সুশিক্ষিত ও মার্জিত লোকের প্রোফাইল থাকে। কেউ যদি সাইন ইন করতে আগ্রহী হন, তাহলে প্রথমে তাকে সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কাগজপত্র (প্রুফ) সাবমিট করতে হয়। এরপর আমরা তার দেওয়া তথ্য যাচাই করি। তার অভিভাবক ও ক্যান্ডিডিয়েটের সাথে কথা বলি। শতভাগ নিশ্চিত হয়ে একজনের প্রোফাইল সক্রিয় করি। আমাদের কাছে যত অ্যাকটিভ প্রোফাইল আছে ততগুলো বাংলাদেশের কোনো পোর্টালেই নেই। সবগুলো প্রোফাইল এনআইডি, অভিভাবক ও প্রার্থীকে দিয়ে থ্রি লেয়ার ভেরিফাইড।’

ফ্রেজার জানান, প্রোফাইর ওপেন করতে একেকজনকে একেক মেয়াদে সাবস্ক্রিপশন নিতে হয়। কেউ তিন হাজার টাকা দিয়ে ৪৫ দিনের সাবস্ক্রিপশন নেন। কেউ আরো কিছু বেশি দিয়ে ছয় মাসের। কেউ এক বছরের। তবে তিনি জানান, একজন ব্যক্তি যদি খুব বেশি নাক উঁচু টাইপের না হন, তাহলে সাধারণত পঁয়তাল্লিশ দিনের প্যাকেজের মধ্যেই তার বিয়েটা হয়ে যায়।

রয়েছে সম্পূর্ণ এসিস্টেন্সি সার্ভিস – ম্যাচমেকিং সার্ভিস, যাদের ডাটাবেজ থেকে খুজে নিজে নিজে যোগাযোগ করে মিটিং ফিক্স করার সময় ও ধৈর্য্য নেই তাদের জন্য এই সেবা। একজন প্রতিনিধি ইউজারের পার্টনার প্রেফারেন্স অনুযায়ী সিভি পাঠানোর পর এপ্রুভ হলে মিটিং ফিক্সড করে দেয়া পর্যন্ত এই সার্ভিস সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে ৬ মাসের মধ্যে বাছাইকৃত ৬০টি প্রোফাইল তাকে পাঠানো হয় ন্যূনতম ১০ মিটিং ফিক্সড করার টার্গেট থাকে আমাদের। 

বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত কি সার্ভিস চলতে থাকে? এমন প্রশ্নের জবাবে ফ্রেজার বলেন, ‘না, তবে তিনি বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সাইটের সব আপডেট প্রোফাইল দেখতে পারবেন, আর যতদিন মেম্বারশিপ নিয়ে থাকবেন ততদিন তিনি পার্টনার প্রেফারেন্স অনুযায়ী প্রোফাইলের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। মেম্বারশিপ শেষ হয়ে গেলে অন্যান্য মেম্বারগণ তার সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন।’

ফ্রেজার আরও জানান, একজন ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট সক্রিয় হওয়ার পর বিভিন্ন সার্চ ক্যাটাগরির মাধ্যমে তার কাঙ্খিত প্রোফাইল খুঁজে পেতে পারেন তিনি। পরে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন অন্য ব্যবহারকারীর সঙ্গে।

ব্যবহারকারীর প্রাইভেসি লঙ্ঘন হওয়ার ঝুঁকি আছে কিনা? জানতে চাইলে তিনি জানালেন, ব্যবহারকারী চাইলে তার সাথে যোগাযোগের সব তথ্য গোপন করে রাখতে পারেন। এমনকি ছবিও লক করে রাখতে পারেন।

ফ্রেজার এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন ২০০৮ সালে। এর আগে তিনি ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে কাজ করতেন। অনলাইনে ব্যবসা করার ইচ্ছা শুরুতেই তার ছিলো। এই ব্যবসায় এলেন কেন?

‘আমি দেখেছি, এই সেক্টরে শুন্যতা আছে। মানুষের ব্যস্ততা বাড়ছে। একজনের সঙ্গে অন্যজনের সাক্ষাতও কম হচ্ছে। যারা বিয়ে করতে চান, তাদেরকে আত্মীয়-স্বজন ও আশপাশের লোকজনের ওপরই নির্ভর করতে হয়। তার হাতে অপশন থাকে কম। পরে বাধ্য হয়ে অনেক বিষয়ে ছাড় দিয়ে বিয়েটা করে নিতে হয় তাদের। কিন্তু তার সামনে যদি অনেকগুলো অপশন থাকতো, তাহলে হয়তো তিনি যেমন রুচির একজনকে খুঁজছেন দেখা যেতো তেমন একজনই তার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি এই সেবাটি চালু করেছি কেবল এই স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করেই। এবং বাস্তবেও হচ্ছে সেটাই।’

বিবাহবিডি ডটকম থেকে সেবা নিয়েছেন এমন একজনের খোঁজ করা হলে পাওয়া যায় মিন্টু মাংসাংকে। তিনি গারো সম্প্রদায়ের লোক। খুঁজছিলেন খৃস্টান ধর্মের গারো মেয়েকে। গারোরা একই গোত্রের কাউকে বিয়ে করতে পারেন না। মিন্টুর চাওয়া ছিলো ‘মাংসাং’ ছাড়া অন্য কোনো গোত্র। তিনি বলেন, ‘গারো কমিউনিটির লোকের সংখ্যা কম। বড় প্ল্যাটফর্মে এখানে পাত্রী পাওয়া কঠিন। তারপরও বিবাহবিডিতে আমি পেয়ে গেলাম।’

ওখানে কি যথেস্ট পরিমাণে গারোদের প্রোফাইল ছিলো?এমন প্রশ্ন করলে মিন্টু বলেন, ‘না। অল্প কয়েকটা প্রোফাইল পেয়েছি। এগুলোর মধ্যেই আমার একটি পছন্দ হয়ে যায়। আমার স্ত্রী কেয়া ভেরোনিকা মান্দা। তার সঙ্গে বেশ ভালো সংসার চলছে। আমাদের দুইটি কন্যাও আছে।’

মো. আরিফুজ্জামান আরিফ। তিনি একটি ফার্মাসিটিক্যালস-এ কাজ করেন। গত বছর বিবাহবিডিতে প্রোফাইল খুলেছিলেন ৬ মাসের জন্য। দুই মাসের মাথায় মনের মতো একজনকে পেয়ে গেছেন। ২৪ জুলাই তিনি বিয়ে করেন মারুফা রহমানকে।

আরিফ বলেন, ‘বিবাহবিডির সেবায় আমি মুগ্ধ। যতদিন প্রোফাইল ছিলো, ওরা আমাকে ইনফরমেশন দিয়ে গেছে। হটলাইনেও নিয়মিত তথ্য পেয়েছি। তবে ওদের হটলাইন সেবার আরও উন্নতি দরকার।’

এ বিষয়ে ফ্রেজারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সেবাগুলো ক্রমেই উন্নত করছি। এখন কেবল হটলাইনে নয়, সারাদেশে প্রতিটি উপজেলায় একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। আশা করছি ২০২২ সালের মধ্যে প্রক্রিয়াটা শেষ হবে। গোটা প্রক্রিয়াটা করছি সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। কাজটা শেষ হয়ে গেলে, আমাদের ভেরিফিকেশন সিস্টেম এবং সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী হবে।’

এতো বড় কাজ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘আমি ২০০৮ সালে শুরু করেছি, অল্প পুঁজিতে। হাতে যদি পুঁজি থাকতো, তাহলে আজকের অবস্থায় আসতে পারতাম আরো দশবছর আগেই। পুঁজি নেই বলে বসে থাকিনি। নতুন কাজ হাতে নিয়েছি। এবারও বসে থাকবো না। তবে যদি কেউ বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন, তাহলে অবশ্যই গতি বাড়বে।’