বাংলাদেশ গত দুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে, মোবাইল আর্থিক সেবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছে এবং ইন্টারনেটের বিস্তার নতুন প্রজন্মের সামনে শিক্ষা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে রয়ে গেছে একটি বড় বৈষম্য—প্রযুক্তির সুযোগ সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের পরিবার, নারী এবং প্রান্তিক এলাকার তরুণদের একটি বড় অংশ এখনো মানসম্মত ইন্টারনেট, কম্পিউটার, ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সুযোগ থেকে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রায় নতুন এক প্রশ্ন সামনে এসেছে: শুধু ইন্টারনেট সংযোগ বাড়ালেই কি ডিজিটাল বৈষম্য দূর হবে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪-২৫ সালের ICT Access and Use by Households and Individuals Survey-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৪৩.৬ শতাংশ, যেখানে শহরাঞ্চলে এই হার ৭৫.৭ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রাম ও শহরের মধ্যে ব্যবধান ৩২.১ শতাংশ পয়েন্ট। একই জরিপে কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৈষম্য উঠে এসেছে।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, দেশের ডিজিটাল অগ্রগতি হলেও প্রযুক্তির সুবিধা ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে।
ইন্টারনেট সংযোগ আছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবহার কতটা?
বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তার ডিজিটাল যোগাযোগকে সহজ করেছে। কিন্তু স্মার্টফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা এবং প্রযুক্তিকে শিক্ষা, গবেষণা, উৎপাদন ও ব্যবসায় কাজে লাগানো এক বিষয় নয়।
একজন শিক্ষার্থী যদি শুধু মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তার কম্পিউটার, প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার কিংবা নির্ভরযোগ্য সংযোগ না থাকে, তাহলে সে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় কতটা এগোতে পারবে? একজন তরুণ উদ্যোক্তা যদি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু অনলাইন বিপণন, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সম্পর্কে দক্ষতা না রাখেন, তাহলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির অর্থ তাই শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ডিভাইসের সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী সেবা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির উৎপাদনশীল ব্যবহার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন বৈষম্য
বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-নির্ভর অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসা এবং সরকারি সেবায় AI নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো, গবেষণা এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ।
বাংলাদেশের জন্য এটি একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে AI, সফটওয়্যার, ডেটা অ্যানালিটিকস, সাইবার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়বে।
এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বাস্তব দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্ভাবনী চিন্তার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কম্পিউটার ল্যাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করতে হবে
ডিজিটাল বৈষম্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ। অনেক নারী অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের অভাব এবং অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা নিতে পারেন না।
অথচ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীদের ঘরে বসে ব্যবসা পরিচালনা, পণ্য বিপণন, ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন শিক্ষা এবং আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সহজ অর্থায়ন, নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ এবং উদ্যোক্তা সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
একইভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিমালা থেকে বাস্তবায়নে যেতে হবে
বাংলাদেশের National Broadband Policy 2024-এ ডিজিটাল সাক্ষরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং জনগণের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা।
সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেবার মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা দিতে হবে।
DPoA বাস্তবায়নে বাংলাদেশের করণীয়
জাতিসংঘের দোহা প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন (DPoA) ২০২২-২০৩১ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন, মানবসম্পদ তৈরি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই কর্মসূচির লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি। প্রযুক্তি যেন শুধু শহরের শিক্ষিত ও উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং গ্রামের কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে—সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
ডিজিটাল উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিয়ে এককভাবে বিচার করা যায় না। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে কত মানুষের শিক্ষা, আয়, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলো, সেটিই হওয়া উচিত অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো প্রযুক্তির বিস্তারকে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয় নয়; এটি সমান সুযোগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিরও প্রশ্ন।

