এলডিসি উত্তরণে নতুন সময় পেল বাংলাদেশ, এখন প্রয়োজন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ

digitalsomoy

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা, জলবায়ু ঝুঁকি ও টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিন বছর কতটা কাজে লাগবে?

স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুন করে তিন বছর সময় পেয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রপ্তানি সক্ষমতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দীর্ঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় দেশটি ২০১৮ ও ২০২১ সালের জাতিসংঘের পর্যালোচনায় উত্তরণের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বরে উত্তরণের কথা ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং টেকসই উত্তরণের প্রস্তুতির প্রয়োজন বিবেচনায় বাংলাদেশ অতিরিক্ত সময় চায়।

এই সময়সীমা বাড়ানোকে শুধু উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও প্রতিযোগিতামূলক, বহুমুখী ও সহনশীল করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রপ্তানি বহুমুখীকরণ

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) গবেষণায় বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে তৈরি পোশাক খাতের অংশ ৮০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকশিল্পের চাহিদা, মূল্য প্রতিযোগিতা কিংবা বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব সামগ্রিক রপ্তানি অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে নতুন বাণিজ্য কৌশল প্রয়োজন।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, আইসিটি সেবা এবং জাহাজ নির্মাণের মতো সম্ভাবনাময় খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য শুধু নতুন শিল্প স্থাপন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পণ্যের গুণগত মান, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন, গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনশক্তি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত করা জরুরি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক উদ্যোক্তা এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়ন, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ই-কমার্স এই উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদকদের বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করা, অনলাইন পেমেন্ট, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিপণন সহজ করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, ব্যাংক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা এবং তাপপ্রবাহের মতো নানা ঝুঁকির মুখোমুখি।

বিশ্বব্যাংকের Bangladesh Country Climate and Development Report-এ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কৃষি, অবকাঠামো, জীবিকা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষি খাতের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া এবং নিরাপদ পানির সংকট স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বা পুনর্বাসন কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ।

সবুজ অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের প্রয়োজন

বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং শ্রম ও পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলার গুরুত্ব বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবেশগত প্রভাবকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি পুনর্ব্যবহারের মতো উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা গেলে একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া টেকসই উত্তরণ কঠিন

এলডিসি উত্তরণ শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রস্তুতির বিষয় নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্বের সম্পর্ক রয়েছে।

উন্নত দেশ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ু অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং বাজার সুবিধা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা জোরদার করতে হবে।

জাতিসংঘের দোহা প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন (DPoA) ২০২২-২০৩১ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

বাংলাদেশের উচিত এই কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সঙ্গে সমন্বয় করা। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

আগামী তিন বছর হতে পারে অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ সময়

বাংলাদেশের জন্য ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়তি প্রস্তুতিকালকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই সময়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে।

এলডিসি উত্তরণ কোনো দেশের উন্নয়নের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি উন্নয়নের একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করবে এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কতটা শক্তিশালী, বহুমুখী, উদ্ভাবনী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব তার ওপর।

অতিরিক্ত তিন বছর বাংলাদেশের জন্য শুধু সময়ের সুযোগ নয়, এটি অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।